ভুমিকা:
হোম ম্যানেজমেন্টের বিভাগ গুলোর মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনা হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়ে ছোট থেকে বড় সব স্বপ্নকেই বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব। প্রতিটি মানুষেরই তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যয় করার মানসিকতা থাকা উচিত। এই সচেতন ও দায়িত্বশীল মানসিকতা গড়ে তুলতে হলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা( Finance Management) সর্ম্পকে যথাযথ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
পারিবারিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা কি?
পারিবারিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে ভবিষ্যতের জীবনকে আরও নিরাপদ ও সুখি জীবন গড়ে তোলা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে পরিবারের বাজেট নির্ধারণ, মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা এবং সঞ্চয়ের মত বিষয়গুলো সহজ ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়। এককথায় বলা যায়, পরিবারের সুখ দুঃখের সঙ্গী হলো অর্থ তাই ভবিষ্যতে অধিক সুবিধা লাভের আশায় অর্থকে পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করার প্রক্রিয়াকেই আর্থিক ব্যবস্থাপনা বলা হয়।
পরিবারের জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব:
পারিবারিক জীবনে আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিক ও গুণমান সম্পন্ন আর্থিক পরিকল্পনার দ্বারা পরিবারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সম্ভব হয়। এর ফলে অল্প ও সিমিত আয়ের মধ্যেও সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সংসার পরিচালনা করা যায়।
পারিবারিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত সঞ্চয় গড়ে তোলা, জরুরি পরিস্থিতির জন্য অর্থ সংরক্ষণ করা, বীমার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব আর্থিক ব্যাপার গুলোকে খুব সহজেই হ্যান্ডেল করা যায়। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা হঠাৎ কোন আর্থিক সংকট মোকাবিলায় এটি পরিবারকে মানসিকভাবে শক্ত রাখে।
পারিবারিক বাজেট তৈরি করার সহজ উপায়:
পারিবারিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ গুলোর মধ্যে একটি হলো সঠীক ভাবে বাজেট তৈরি করা। বাজেট হলো খুবই জরুরি ও প্রয়োজনীয় একটি আর্থিক পরিকল্পনা। যার মাধ্যমে পরিবারের মোট মাসিক আয় থেকে সম্ভাব্য ব্যয়ের সুস্পস্ট ধারণা পাওয়া যায়। নিম্নে বাজেট তৈরির উপায় গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
১.আলাদা আলাদা খাতে অর্থ ভাগ করা:
প্রথমে বাড়িতে আলাদা অলাদা করে ব্যাংক বক্স বা খাম তৈরি করতে হবে, যাতে বাজেট অনুযায়ী নির্ধারিত অর্থ সেই নির্দিষ্ট খাতে সংরক্ষণ করা যায়। এতে খরচ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
২.নিয়মিত ব্যয়ের তালিকা তৈরি করা:
এরপর মসিক বাজেট খাতায় নিয়মিত ব্যয় গুলো লিখে নিতে হবে। যেমন- খাবার, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, গাড়ীর তেল খরচ, মাসিক সঞ্চয় আলাদা করে লিখে নিতে হবে। এর ফলে প্রত্যেক মাসে ফিক্সড ব্যয় কত হচ্ছে সহজে জানা যায়।
৩.অনিয়মিত ব্যয় চিহ্নিত করা:
নিয়মিত ব্যয়ের পাশাপাশি অনিয়মিত ব্যয়ের তালিকাও তৈরি করা জরুরি। যেমন- আত্মীয়ের আমন্ত্রণ রক্ষা, দান-সাহায্য, ব্যক্তিগত যত্নের সামগ্রী ইত্যাদি।
৪.সঞ্চয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া:
বাজেট তৈরি করার সময় সঞ্চয়কে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনেকেই আয় থেকে ব্যয় করার পর যদি কিছু অর্থ অবশিষ্ট থাকে তবেই সঞ্চয় করেন, যা একটি ভুল পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ ভবিষ্যতে আর্থিক নিরাপত্তা অনেকটাই সঞ্চয়ের উপর নির্ভর করে।
৫.সুদের ওপর ঋণ নেওয়া থেকে এড়িয়ে চলা:
স্বপ্ন পূরণের জন্য সুদের ওপর ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম। উদাহরণস্বরূপ, একটি ফ্রিজ কেনার ক্ষেত্রে কিস্তিতে সুদসহ ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে প্রতি মাসে সেই অর্থ সঞ্চয় করে কিছুদিন পর ফ্রিজটি কেনা যেতে পারে। এতে স্বপ্ন পূরণে একটু বেশি সময় লাগলেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়না এবং ঋণের মানসিক চাপ থেকেও মুক্ত থাকা যায়।
👉টিপস: তাহলে কখন ঋণ নেওয়া যুক্তিসংগত?
মনে রাখতে হবে সব ধরনের ঋণ ক্ষতিকর নয়। যেসব ক্ষেত্রে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগ থেকে অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব হয় এবং ঋণ পরিশোধের পরও নিয়মিত অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকে, সেসব ক্ষেত্রেই ঋণ নেওয়া তুলনামূলকভাবে যুক্তিসংগত।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি ঋণ করে ফ্রিজ কেনার পরিবর্তে সেই অর্থ দিয়ে ছোট পরিসরে কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারেন, যেমন-ছোট কেক বেকারি, কাপড়ের দোকান, হোমমেড ঘি বা আচার তৈরি। এই ধরনের আয়মুখী কাজে বিনিয়োগ করলে শুরুতে ঋণ থাকলেও ভবিষ্যতে নিয়মিত আয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ঋণ শোধ করা সম্ভব হয়। এছাড়াও এর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো-এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনি ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারবেন।
পারিবারিক সঞ্চয়ের গুরুত্ব:
আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সঞ্চয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সঞ্চয় হলো এমন একটি ইতিবাচক অভ্যাস, যা পরিবারকে ভবিষ্যতে আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে সুরক্ষা দেয়। সঞ্চয় মানে শুধু অর্থ জমানো নয়, এটি প্রতিটি মানুষের (backbone) হিসাবে কাজ করে। নিয়মিত সঞ্চয় থাকলে হঠাৎ কোন ক্ষতি বা বিপর্যয়ের ভয় অনেকটাই কমে যায় এবং কিছু হারানোর ভয় থাকে না।
সঞ্চয়ের প্রধান গুরুত্ব গুলি নিচে উল্লেখ করা হল-
- আর্থিক সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করা:- নিয়মিত সঞ্চয় করার ফলে মানুষকে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল ও ধনী হতে সাহায্য করে।
- বার্ধক্যজনিত নিরাপত্তা প্রদান:- বৃদ্ধ বয়সে আয়ের সুযোগ কমে গেলে সঞ্চিত অর্থ তখন বড় সহায়ক ও ভরসা হয়ে কাজ করে।
- জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়ক হয়:- চিকিৎসা, উচ্চ শিক্ষা, বিয়ে, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার মতো জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে সঞ্চয় অত্যন্ত কার্যকর ভুমিকা পালন করে।
- মানসিক শান্তি ও চিন্তামুক্ত জীবন নিশ্চিত করে:- যখন ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক প্রস্তুতি থাকে, তখন জীবনের নানা ধরনের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়।
- ছোটো-বড় সব ধরনের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করে:- সঞ্চয়ের মাধ্যমে ধিরে ধিরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ও স্বপ্ন গুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
- সুদের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে:- ব্যাংক ও বীমার মাধ্যমে সঞ্চয় করলে তার ওপর সুদ পাওয়া যায়, যা দীর্ঘ মেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠে।
সন্তানের জীবনে আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রভাব:
পরিবারে সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা থাকলে তার প্রভাব সন্তানের জিবনে সবচেয়ে বেশি পড়ে। শিশুরা বাবা মায়ের আচরণ ও সিদ্ধান্ত দেখে শেখে। তাই পরিবারে যদি পরিকল্পিতভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব রেখে সংসার পরিচালনা করা হয়, তবে সন্তানদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা গড়ে উঠে।
সন্তানের জীবনে আর্থিক ব্যবস্থাপনার সুবিধা:-
১. ছোটবেলা থেকেই অর্থের মূল্য বুঝতে শেখে- পরিকল্পিত আর্থিক পরিবেশে বেড়ে উঠা সন্তান ছোটবেলা থেকেই অর্থের গুরুত্ব ও ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা অবলম্বন করে।
২. স্বপ্ন পূরণে ধৈর্য ও সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা শেখে- সন্তান বুঝতে শেখে যে কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুধু ইচ্ছা নয় ধৈর্য ও নিয়মিত সঞ্চয়- দুটোরই প্রয়োজন।
৩. অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা থেকে বিরত থাকে- আর্থিক শৃঙ্খলা দেখে বড় হওয়ায় সন্তান ধীরে ধীরে অযথা খরচ এড়িয়ে চলতে শেখে।
৪. সঞ্চয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করে – নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস সন্তানের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ধারণা তৈরী করে।
৫. স্বনির্ভর হওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠে- আর্থিক ব্যবস্থাপনার শিক্ষা সন্তানের মনে আত্মনির্ভরশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠার মোনোভাব তৈরি করে।
✍️টিপস: সন্তানকে সঞ্চয়ের মূল্যবোধ শেখানোর কার্যকর উপায়
আপনার সঞ্চিত অর্থ সন্তানের কাছ থেকে যতটা সম্ভব গোপণ রাখার চেষ্টা করুন। কারন সন্তানের মধ্যে অর্থের মূল্যবোধ তৈরি করতে হলে তার মনে সীমিত প্রাপ্তির ধারণা বা অভাববোধ তৈরি করা জরুরি। উল্লিখিত পাঁচটি বিষয়গুলো সন্তানের জীবনে সফলভাবে প্রয়োগ করতে হলে তাকে বুঝাতে হবে সবকিছু একসাথে পাওয়া যায় না এবং মানব জীবনে অর্থের মূল্য অপরিসীম।
👉বাস্তব উদাহরন:– ধরুন আপনার সন্তান একটি সাইকেল কেনার জন্য বায়না বা আবদার করছে তখন তাকে এভাবে বলতে পারেন – ” সোনা সাইকেল অবশ্যই কিনে দেবো তবে, এখনই নয়। আমাদের একটু সময় লাগবে। আজ থেকে তুমি আমি, বাবা সবাই মিলে এই ব্যাংক বক্সে টাকা জমাবো। এছাড়া দাদু, দিদা, মামা তোমাকে ভালোবেসে উপহার হিসেবে যে টাকা গুলো দেবে সেটাও এই বক্সে রাখবো। কিছুদিন পর জমানো পর্যাপ্ত টাকা দিয়ে তখন আমরা তোমার পছন্দের একটি সাইকেল কিনব।”
👍এর মাধ্যমে সন্তান কি কি শিখবে?
- ত্যাগ ও পরিকল্পনার গুরুত্ব- সহজে কোনো কিছু পাওয়া যায় না। কিছু পেতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।
- ধৈর্য ধরার অভ্যাস- অপেক্ষা করতে শিখবে।
- সঞ্চয়ের মূল্যবোধ– টাকা জমানোর গুরুত্ব যে কতখানি তা উপলব্ধি করবে।
- নিয়ম-শৃঙ্খলা- সন্তান আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এর ফলে সন্তানের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলার অভ্যাস তৈরি হবে।
- কৃতজ্ঞতা ও যত্ন- নিজের জমানো টাকায় কেনা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার ফলে জিনিসের প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন দ্বিগুণ বেড়ে যাই।
শিশুর জীবনে সঞ্চয়ের গুরুত্ব শেখানোর পাশাপাশি তাকে আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী মানসিকতার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের পরবর্তী আর্টিকেল “সন্তানের মানসিক বিকাশ: Do’s & Don’ts সহ সম্পূর্ণ প্যারেন্টিং গাইড” অবশ্যই পড়ুন। একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আপনার ছোট্ট উদ্যোগই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।
উপসংহার:
পারিবারিক আর্থিক ব্যবস্থা মানে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব এটা ভাবা ঠিক হবে না। বরং পরিবারের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বপ্নপূরণের সঙ্গেও অর্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অল্প আয় হলেও নিয়মিত সঞ্চয় ও সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি পরিবার ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে শক্ত ভিত গড়ে তুলতে পারে।
আজ থেকেই পরিবারের ছোট ছোট আর্থিক অভ্যাস বদলানো শুরু করুন-ভবিষ্যৎ নিজেই সুন্দর হয়ে উঠবে।